কেন ‘কৃত্রিম সূর্য’ বানাচ্ছে চীন

শক্তি বা জ্বালানির জন্য মানুষ চিরকালই প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত হওয়ায় বিজ্ঞানীরা সবসময়ই এমন এক শক্তির উৎস খুঁজছিলেন যা কখনো শেষ হবে না। এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে চীন তৈরি করছে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পরমাণু চুল্লি, যা সাধারণ মানুষের কাছে ‘কৃত্রিম সূর্য’ নামে পরিচিত। দক্ষিণ চীনের আনহুই প্রদেশের হেফেই শহরে অবস্থিত এই প্রকল্পের নাম ‘এক্সপেরিমেন্টাল অ্যাডভান্সড সুপারকন্ডাক্টিং টোকামাক’ (EAST)।কেন এই প্রযুক্তি বানাচ্ছে চীন?সহজ ভাষায় বলতে গেলে, আমাদের সূর্য যেভাবে শক্তি উৎপন্ন করে, চীন ঠিক সেই একই পদ্ধতি পৃথিবীতে প্রয়োগ করতে চাইছে। সূর্য নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রক্রিয়ায় হাইড্রোজেন থেকে হিলিয়াম তৈরির মাধ্যমে অবারিত তাপ ও আলো দেয়। চীন এই একই প্রক্রিয়া একটি যন্ত্রের মধ্যে ঘটিয়ে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চায়। বর্তমানে প্রচলিত পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো ‘ফিশন’ পদ্ধতিতে চলে, যাতে তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের ঝুঁকি থাকে। কিন্তু কৃত্রিম সূর্যের এই ‘ফিউশন’ প্রযুক্তি হবে সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব এবং বর্জ্যহীন।কৃত্রিম সূর্য বানানোর মূল উদ্দেশ্য১. অফুরন্ত জ্বালানি: এই প্রযুক্তির মাধ্যমে সমুদ্রের পানি থেকে পাওয়া হাইড্রোজেন ব্যবহার করে কোটি কোটি বছরের জন্য জ্বালানি নিশ্চিত করা সম্ভব।২. পরিবেশ রক্ষা: এতে কোনো গ্রিনহাউস গ্যাস বা কার্বন নিঃসরণ হয় না, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।৩. বিপন্মুক্ত শক্তি: প্রথাগত পারমাণবিক চুল্লির মতো এতে বিস্ফোরণের ঝুঁকি নেই।কবে আলোর মুখ দেখবে এই প্রকল্প?প্রকল্পটি এখন আর কেবল গবেষণার পর্যায়ে নেই, বরং এটি বড় ধরনের মাইলফলক স্পর্শ করেছে। ২০২৪ এবং ২০২৫ সালের পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই চুল্লি সূর্যের চেয়েও প্রায় ১০ গুণ বেশি তাপ (প্রায় ১৫ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস) দীর্ঘ সময় ধরে ধরে রাখতে সক্ষম হচ্ছে। চীনের লক্ষ্য হলো ২০৩৫ সালের মধ্যে একটি প্রোটোটাইপ বা পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র চালু করা এবং ২০৫০ সালের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে সাধারণ মানুষের ঘরে এই বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া।বিশ্বের অন্য দেশ ও চীনের ব্যতিক্রমী অবস্থানচীন একা নয়, ফ্রান্সের নেতৃত্বে ৩৫টি দেশ মিলে ‘আইটিইআর’ নামে একটি আন্তর্জাতিক কৃত্রিম সূর্য প্রকল্প তৈরি করছে। তবে চীন এই ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম কারণ তাদের ‘ইস্ট’ (EAST) প্রকল্পটি অনেক বেশি গতিশীল। চীন নিজেদের প্রযুক্তিতে যেভাবে প্লাজমা কন্ট্রোল এবং অতি উচ্চ তাপমাত্রা দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীল রাখতে পেরেছে, তা অন্য দেশগুলোর জন্য এখন আদর্শ হয়ে দাঁড়িয়েছে।বিনিয়োগ ও নেপথ্যের কারিগরএই প্রকল্পে চীন সরকার এখন পর্যন্ত বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। ধারণা করা হয়, এর পেছনে প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের (১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি) প্রাথমিক বিনিয়োগ রয়েছে এবং প্রতি বছর গবেষণায় আরও বিশাল অংকের অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে।এই অভাবনীয় প্রযুক্তির নেপথ্যে কাজ করছেন চীনের ইনস্টিটিউট অফ প্লাজমা ফিজিক্স এবং হেফেই ইনস্টিটিউট অফ ফিজিক্যাল সায়েন্সের একদল মেধাবী বিজ্ঞানী। এর সাথে যুক্ত রয়েছে ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি অফ চায়না। চীনের সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘চায়না ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার কর্পোরেশন’  এটি নির্মাণে প্রধান ভূমিকা পালন করছে।বিশেষজ্ঞের অভিমতচীনের এই বৈজ্ঞানিক বিপ্লব সম্পর্কে মালিশাএডু-র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডাক্তার মারুফ মোল্লা বলেন,"চীনের ‘কৃত্রিম সূর্য’ প্রকল্প কেবল বিজ্ঞানের জয়যাত্রা নয়, এটি মানবসভ্যতাকে পরবর্তী ধাপে নিয়ে যাওয়ার একটি সাহসী পদক্ষেপ। ভবিষ্যতে সস্তা এবং ক্লিন এনার্জি বা পরিচ্ছন্ন জ্বালানির জন্য বিশ্বকে চীনের এই প্রযুক্তির ওপরই নির্ভর করতে হবে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর উচিত চীনের এই বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং আমাদের মেধাবী শিক্ষার্থীদের এসব উন্নত গবেষণায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া।"পরিশেষে বলা যায়, চীনের এই ‘কৃত্রিম সূর্য’ যদি সফলভাবে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে, তবে বিশ্বের জ্বালানি সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে এবং পৃথিবী ফিরে পাবে এক দূষণমুক্ত ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা।

প্রযুক্তি
অর্থনীতি