চীনে আর্ন্তজাতিক ভিসা-মাস্টারকার্ড কি অকেজো
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনে যাওয়ার আগে পর্যটক বা ব্যবসায়ীদের মনে এখন একটিই বড় প্রশ্ন— পকেটে ভিসা বা মাস্টারকার্ড থাকা মানেই কি সেখানে নিশ্চিন্তে লেনদেন করা যাবে? উত্তরটি বেশ জটিল। চীনে আন্তর্জাতিক কার্ডগুলো পুরোপুরি ‘অকেজো’ নয়, তবে প্রচলিত পশ্চিমা ব্যবস্থার চেয়ে চীন এখন অনেক বেশি স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং ভিন্ন এক ডিজিটাল ব্যবস্থায় বাস করছে। যেখানে কিউআর কোডের এক স্ক্যানেই নিমিষে সম্পন্ন হয় কোটি টাকার লেনদেন, সেখানে পশ্চিমা বিশ্বের দাপুটে কার্ডগুলো প্রায় অপ্রাসঙ্গিক।
আর্ন্তজাতিক ক্রেডিট-ডেবিট কার্ড কি সত্যিই বন্ধ
চীন আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড কখনো ‘বন্ধ’ করেনি। তবে ২০০২ সাল থেকে নিজস্ব পেমেন্ট নেটওয়ার্ক ‘চায়না ইউনিয়ন পে’ চালুর পর থেকে বিদেশি কার্ডের প্রয়োজনীয়তা চীনে অভ্যন্তরীণভাবে কমতে শুরু করে। বড় হোটেল, বিলাসবহুল শপিং মল এবং নামী রেস্তোরাঁগুলোতে এখনো ভিসা বা মাস্টারকার্ড গ্রহণ করা হয়। তবে স্থানীয় মুদি দোকান, ট্যাক্সি বা সাধারণ খাবারের দোকানে এসব কার্ড একেবারেই চলে না।
এর কারণ কী
চীন মূলত তাদের আর্থিক সার্বভৌমত্ব এবং তথ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিজস্ব পেমেন্ট ইকোসিস্টেম গড়ে তুলেছে। আলিপে (Alipay) এবং উইচ্যাট পে (WeChat Pay) এর মাধ্যমে তারা এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছে যেখানে প্লাস্টিক কার্ডের বদলে কিউআর (QR) কোডই প্রধান। চীন চায় তাদের দেশের প্রতিটি লেনদেন যেন তাদের নিজস্ব সার্ভারের মাধ্যমে হয়, যাতে বিদেশি কোনো সংস্থা তাদের আর্থিক তথ্য নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে।
বিকল্প ব্যবস্থা ও চীনের কৌশলী পরিবর্তন
চীনে লেনদেনের প্রধান বিকল্প হলো মোবাইল পেমেন্ট। দেশটির ৯৮ শতাংশের বেশি ডিজিটাল লেনদেন হয় আলিপে এবং উইচ্যাট পে-র মাধ্যমে। এমনকি ভিক্ষুকরাও এখন কিউআর কোড ব্যবহার করে সাহায্য নেন। চীন মূলত একটি 'কার্ড-নির্ভর' সমাজ থেকে সরাসরি 'মোবাইল-নির্ভর' সমাজে রূপান্তর ঘটিয়েছে, যা বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের চেয়েও দ্রুতগতির।
বিদেশিদের ভোগান্তি কতটা
গত কয়েক বছর ধরে বিদেশিরা চীনে গিয়ে ভয়াবহ সমস্যায় পড়ছিলেন। কারণ আলিপে বা উইচ্যাট ব্যবহার করতে হলে চীনের স্থানীয় ব্যাংক অ্যাকাউন্টের প্রয়োজন হতো। ফলে অনেক বিদেশি পর্যটক একটি কফি কিনতেও হিমশিম খেয়েছেন।
তবে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। ২০২৪ সাল থেকে চীন সরকার বিদেশিদের সুবিধার্থে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। এখন আলিপে এবং উইচ্যাট অ্যাপে সরাসরি বিদেশি ভিসা বা মাস্টারকার্ড যুক্ত করা যাচ্ছে। এর ফলে স্থানীয় অ্যাকাউন্ট ছাড়াই বিদেশিরা কিউআর কোড স্ক্যান করে পেমেন্ট করতে পারছেন। এছাড়াও বিদেশি ট্যুরিস্টদের জন্য ৫ শতাংশ পর্যন্ত লেনদেন ফি মওকুফ এবং ট্রানজ্যাকশন লিমিট বাড়ানোর মাধ্যমে সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে বেইজিং।
এটিএম থেকে টাকা উত্তোলন
আন্তর্জাতিক কার্ড দিয়ে চীনের ভেতরে এটিএম বুথ থেকে টাকা তোলা এখনো সম্ভব। তবে সব বুথে নয়। যে সকল এটিএম-এ ভিসা, মাস্টারকার্ড বা প্লাস (Plus) লোগো আছে, সেখান থেকে রেনমিনবি (RMB) উত্তোলন করা যায়। তবে এক্সচেঞ্জ রেট এবং উচ্চ ফি’র কারণে এটি খুব একটা সাশ্রয়ী নয়।
বিদেশি টানতে কি পিছিয়ে পড়ছে চীন?
পেমেন্ট সিস্টেমের এই ভিন্নতার কারণে পর্যটনের ক্ষেত্রে চীন কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল। অনেক বিদেশিই ডিজিটাল জটিলতার ভয়ে চীনে যেতে দ্বিধাবোধ করেন। এটি বুঝতে পেরে চীন সম্প্রতি পাসপোর্ট-মুক্ত ট্রানজিট এবং ডিজিটাল পেমেন্ট সহজীকরণের দিকে মনোযোগ দিয়েছে। মূলত 'দিদিপে' (ট্যাক্সির জন্য) এবং আলিপে-র ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা এখন বিদেশিদের আত্মবিশ্বাস বাড়াচ্ছে।
চীনে ভিসা বা মাস্টারকার্ড অকেজো নয়, তবে এটি এখন কেবল ব্যাকআপ হিসেবে কার্যকর। চীনের রাস্তায় স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে হলে এখন স্মার্টফোনে আলিপে বা উইচ্যাট সেটআপ করে নেওয়া খুব জরুরি। চীন প্রমাণ করেছে যে, তারা কেবল পণ্য উৎপাদনে নয়, আর্থিক লেনদেনের ধরনেও পশ্চিমা বিশ্বের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে এক অনন্য মডেল তৈরি করতে সক্ষম।
# ২৫ এপ্রিল ২০২৬