ডিজিটালি ২২ কোটি গাছ লাগিয়েছে চীন: মরুভূমি হলো সবুজ বন

আসিফুল হাসনাত সিদ্দিকী
০৩ মার্চ, ২০২৬
ডিজিটালি ২২ কোটি গাছ লাগিয়েছে চীন: মরুভূমি হলো সবুজ বন
ডিজিটালি ২২ কোটি গাছ লাগিয়েছে চীন: মরুভূমি হলো সবুজ বন
শেয়ার

চীন মানেই কি কেবল বিশাল ধোঁয়ার চিমনি আর ইট-পাথরের জঙ্গল? পশ্চিমা মিডিয়া বা আমাদের চিরচেনা ধারণায় চীনকে হয়তো এভাবেই দেখানো হয়। কিন্তু আধুনিক চীন এক নিঃশব্দ সবুজ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা আমাদের কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি আধুনিক এবং কার্যকর। বিশেষ করে যখন শুনবেন, কোটি কোটি সাধারণ মানুষ তাদের স্মার্টফোন ব্যবহার করে মরুভূমিতে ২২ কোটিরও বেশি আসল গাছ রোপণ করেছে, তখন অবাক হওয়াটাই স্বাভাবিক। চীনের এই জাদুকরী প্রকল্পের নাম— 'অ্যান্ট ফরেস্ট' (Ant Forest)।

 

আইডিয়াটি কার?
২০১৬ সালের আগস্ট মাসে চীনের টেক জায়ান্ট আলিবাবা গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান 'অ্যান্ট ফিন্যান্সিয়াল' (বর্তমানে অ্যান্ট গ্রুপ) একটি অভিনব আইডিয়া নিয়ে আসে। আইডিয়াটি ছিল মূলত এরিক জিং (Eric Jing)-এর নেতৃত্বে থাকা একদল উদ্ভাবকের। তারা চাইলেন জলবায়ু পরিবর্তন রোধে সাধারণ মানুষকে কেবল সচেতন নয়, বরং সরাসরি সক্রিয় করতে। তারা এমন এক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করলেন যেখানে মানুষের দৈনন্দিন ভালো কাজগুলো ভার্চুয়াল পয়েন্টে রূপান্তরিত হবে এবং সেই পয়েন্ট দিয়ে মরুভূমিতে রোপণ করা হবে একটি জীবন্ত গাছ।

 

যেভাবে কাজ করে এই ডিজিটাল জাদুকরী
'অ্যান্ট ফরেস্ট' মূলত আলিপে (Alipay) অ্যাপের ভেতরে থাকা একটি সোশ্যাল এবং গেমিং ফিচার। একজন ব্যবহারকারী যখন পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন করেন—যেমন গাড়ির বদলে হেঁটে অফিসে যান, প্লাস্টিক ব্যাগের বদলে কাগজের ব্যাগ ব্যবহার করেন, বা অনলাইনে বিদ্যুৎ বিল দিয়ে কাগজের অপচয় রোধ করেন—তখন তিনি এই অ্যাপে 'কার্বন এনার্জি' বা পয়েন্ট পান।

 

যখন একজন ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত পয়েন্ট জমা হয়, তিনি অ্যাপের ভেতর একটি ভার্চুয়াল গাছ বড় করতে পারেন। সেই ভার্চুয়াল গাছটি পূর্ণতা পেলে, অ্যান্ট গ্রুপ ব্যবহারকারীর হয়ে চীনের মরুভূমি এলাকায় একটি আসল চারা গাছ রোপণ করে এবং সেটির ওপর ব্যবহারকারীর নাম ও ডিজিটাল কোড সেঁটে দেয়। এমনকি ব্যবহারকারী স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নিজের লাগানো সেই গাছের অবস্থানও দেখতে পারেন।

 

 

৫০০ মিলিয়ন মানুষ ২২ কোটি গাছ রোপন করেছেন
চীনের সাধারণ মানুষের মধ্যে এই উদ্যোগ এমনভাবে সাড়া ফেলেছিল যা বিশ্বজুড়ে পরিবেশবিদদের অবাক করে দিয়েছে। চীনের প্রায় ৬০০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ (অর্থাৎ চীনের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক) এই কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন। এই ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ২২ কোটিরও বেশি প্রকৃত গাছ রোপণ করা হয়েছে; যেখানে আগে কোন গাছই ছিল না। এই উদ্যোগের ফলে চীনের ইনার মঙ্গোলিয়া, গানসু এবং কিংহাই প্রদেশের প্রায় ৩৯ লক্ষ একর (১.৬ মিলিয়ন হেক্টর) খাঁ খাঁ মরুভূমি এখন সবুজ বনভূমিতে রূপান্তরিত হয়েছে।

 

ব্যতিক্রমী উদ্যোগ কেন 
অনেকে মনে করেন চীনের সবকিছুই সরকারি নির্দেশে হয়। কিন্তু 'অ্যান্ট ফরেস্ট'-এর সাফল্য এসেছে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবী ও গেমিফিকেশন পদ্ধতির মাধ্যমে। এটি কোনো চাপিয়ে দেওয়া নিয়ম ছিল না, বরং সাধারণ মানুষ এটিকে একটি 'ডিজিটাল গেম' হিসেবে নিয়েছে। একজন ব্যবহারকারী যখন তার বন্ধুর প্রোফাইল থেকে 'কার্বন এনার্জি' চুরি করতে পারেন বা বন্ধুকে এনার্জি উপহার দিতে পারেন, তখন এটি একটি সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। এভাবেই কোনো বড় প্রোপাগান্ডা ছাড়াই মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ২২ কোটি গাছ লাগানোর বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে।

 

জাতিসংঘের সর্বোচ্চ সম্মান: 'চ্যাম্পিয়নস অফ দ্য আর্থ'
চীনের এই প্রযুক্তিগত পরিবেশবাদী বিপ্লব বিশ্বমঞ্চের নজর এড়াতে পারেনি। ২০১৯ সালে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP) তাদের সর্বোচ্চ পরিবেশ সম্মান 'চ্যাম্পিয়নস অফ দ্য আর্থ' (Champions of the Earth) পদক প্রদান করে 'অ্যান্ট ফরেস্ট' প্রকল্পকে। জাতিসংঘ তাদের বিবৃতিতে জানায়, ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা তৈরির এটি একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত।

 

অ্যান্ট ফরেস্ট এখন সমুদ্রের তলদেশে প্রবাল প্রাচীরও রক্ষা করছে 
অনেকেই ভাবেন এটি হয়তো সাময়িক কোনো প্রচার ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, 'অ্যান্ট ফরেস্ট' ক্যাম্পেইনটি আজও সফলভাবে চলছে। এটি এখন কেবল গাছ লাগানোতেই সীমাবদ্ধ নেই; তারা এখন সমুদ্রের তলদেশে প্রবাল প্রাচীর রক্ষা এবং বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য তৈরির কাজও ডিজিটাল পয়েন্টের মাধ্যমে পরিচালনা করছে। এমনকি অনেক আন্তর্জাতিক কোম্পানি এখন এই মডেলটি অনুসরণ করার চেষ্টা করছে।

 

চীন নিয়ে আমাদের যে ভুল ধারণাগুলো আছে, 'অ্যান্ট ফরেস্ট' তার মধ্যে অন্যতম একটির জবাব দেয়। চীন কেবল কার্বন নিঃসরণকারী দেশ নয়, বরং তারা জানে কীভাবে আধুনিক প্রযুক্তি আর সাধারণ মানুষের সংহতিকে কাজে লাগিয়ে পৃথিবীকে আবার সবুজ করা যায়। স্মার্টফোনের একটি ক্লিকের মাধ্যমে যে কোটি কোটি গাছ লাগানো সম্ভব—চীন তা বিশ্বকে হাতে-কলমে দেখিয়ে দিয়েছে।

মতামত