দক্ষিণ চীন সাগরে গোলযোগ সৃষ্টিতে জাপানের একাধিক চক্রান্ত ফাঁস: সিএমজি সম্পাদকীয়
জুলাই ১৫: তথাকথিত ‘দক্ষিণ চীন সাগর সালিশি মামলার’ রায় ঘোষণার দশম বার্ষিকীতে, দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুর কোনো পক্ষ না হয়েও জাপান এ বিষয়ে আবার উসকানিমূলক মন্তব্য করেছে। জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তোশিমিৎসু মোতেগি প্রকাশ্যে ওই অবৈধ ‘রায়’-এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন এবং চীনের বৈধ দাবিগুলোর তীব্র সমালোচনা করেছেন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, ফিলিপাইনসহ আরও ১৪টি দেশের সঙ্গে একটি তথাকথিত ‘যৌথ বিবৃতি’ প্রকাশ করেছে জাপান, যেখানে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের ঐতিহাসিক অধিকার অস্বীকার করা হয়েছে।
দীর্ঘ পরিকল্পিত এই রাজনৈতিক নাটক দক্ষিণ চীন সাগরে জাপানের হস্তক্ষেপ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করার অশুভ উদ্দেশ্য প্রকাশ্যে এনেছে। চীন ইতোমধ্যে এ নিয়ে জাপানের কাছে কঠোর প্রতিবাদ জানিয়েছে, গভীর অসন্তোষ ও নিন্দা প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে জানিয়েছে, জাপানের উসকানির দৃঢ় ও কার্যকর জবাব দেওয়া হবে এবং চীনের ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্ব ও সামুদ্রিক অধিকার দৃঢ়ভাবে রক্ষা করা হবে।
দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুতে জাপানের ঐতিহাসিক দায় আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান অবৈধভাবে দক্ষিণ চীন সাগরের দ্বীপপুঞ্জ ও প্রবালপ্রাচীর দখল করেছিল। যুদ্ধ শেষে কায়রো ঘোষণা ও পটসডাম ঘোষণাসহ আন্তর্জাতিক আইনি দলিলের ভিত্তিতে দ্বীপগুলোর ওপর পুনরায় সার্বভৌম অধিকার প্রয়োগ শুরু করে চীন, যা যুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
তবে, দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে জাপানের উচ্চাকাঙ্ক্ষা কখনও শেষ হয়ে যায়নি। দশ বছর আগে তথাকথিত ‘দক্ষিণ চীন সাগর সালিশি’ রায়ের নেপথ্যে কলকাঠি নেড়েছে জাপান। গত এক দশকে জাপান ধারাবাহিকভাবে ওই অবৈধ ‘রায়’-এর পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে এসেছে এবং এর মাধ্যমে চীনের ওপর চাপ তৈরি করে চীনকে হেয় করার চেষ্টা করেছে।
অন্যদিকে, ২০২২ সালে মার্কোস প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর দক্ষিণ চীন সাগরে বারবার উসকানিমূলক ও অধিকার লঙ্ঘনকারী কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছে ফিলিপাইন। জাপান এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ফিলিপাইনকে সামরিকভাবে শক্তিশালী করছে এবং দুই দেশের মধ্যে একটি ‘আধা-সামরিক জোট’ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যু ব্যবহার করে চীনকে মোকাবিলা করা, শান্তিবাদী সংবিধান থেকে বেরিয়ে আসা, সামরিকবাদকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক আধিপত্য পুনরুদ্ধারের যে উদ্দেশ্য জাপান পোষণ করছে, তা এখন অনেকটাই সুস্পষ্ট।
যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল’-এ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে জাপান। ফিলিপাইনকে সামরিকভাবে শক্তিশালী করার মাধ্যমে দক্ষিণ চীন সাগরে উত্তেজনার কেন্দ্র তৈরি করা এবং পরবর্তীতে পূর্ব চীন সাগর ও তাইওয়ান প্রণালিকে যুক্ত করে তথাকথিত ‘তিন সাগর সংযোগ’ গড়ে তুলে চীনকে কৌশলগতভাবে মোকাবিলার চেষ্টা করছে তারা।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে জাপানের হোসেই বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হিরোশি শিরাতোরি বলেন, জাপান অবৈধ ‘রায়’ নিয়ে যে প্রচারণা চালাচ্ছে, তা মূলত তথাকথিত ‘ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল’ বাস্তবায়নের স্বার্থে করছে। ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে একতরফাভাবে সংঘাত উসকে দেওয়া এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করা উচিত নয় বলে জানান অধ্যাপক হিরোশি।
এ ছাড়া, জাপানের ডানপন্থী শক্তিগুলোর সামরিক সম্প্রসারণের একটি প্রচলিত কৌশলই হলো দক্ষিণ চীন সাগরে উত্তেজনা বাড়ানো। দশ বছর আগে তথাকথিত ‘দক্ষিণ চীন সাগর সালিশি’ প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখা থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ফিলিপাইনে অস্ত্র সরবরাহ, জাপানি আত্মরক্ষা বাহিনীর বিদেশে অবস্থান এবং দেশের বাইরে গোলাবর্ষণ মহড়া—প্রতিটি পদক্ষেপেই জাপান তার ‘একচেটিয়া প্রতিরক্ষা’ নীতির সীমা অতিক্রম করছে।
জাপানের এসব করার উদ্দেশ্য হলো—পরাজিত দেশ হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিধিনিষেধ থেকে বেরিয়ে আসা, পুনরায় সামরিকীকরণ ত্বরান্বিত করা, দূরপাল্লার সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করা এবং সামরিকবাদ পুনরুজ্জীবিতকরণের পথ তৈরি করা।
শুধু তাই নয়, সামরিক সহায়তা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার মাধ্যমে জাপান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে চীন বিষয়ে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর অভিন্ন অবস্থান দুর্বল করতে চাইছে এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টাও করছে।
মোটকথা, ওই অবৈধ ‘রায়’কে কেন্দ্র করে নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সামুদ্রিক নিয়মকানুন প্রচার এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের তথাকথিত ‘সমুদ্র শক্তি’ হওয়ার ঔপনিবেশিক আকাঙ্ক্ষা পুনরুজ্জীবিত করতে চাইছে জাপান।
সূত্র: ওয়াং হাইমান, চায়না মিডিয়া গ্রুপ।