পশ্চিমা সাম্রাজ্যকে টপকে চীনের মহাকাশ স্টেশন ‘তিয়াংগং’এর জয়
মহাকাশ বিজ্ঞানে গত তিন দশক ধরে চলা পশ্চিমা আধিপত্যের দিন ফুরিয়ে আসছে। ১৯৯৮ সালে চালু হওয়া আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (ISS) যখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ এবং অবসরে যাওয়ার অপেক্ষায়, তখন মহাকাশে এক নতুন তারার উদয় হয়েছে—চীনের নিজস্ব মহাকাশ স্টেশন ‘তিয়াংগং’ (Tiangong)। ২০৩০ সালের মধ্যে যখন ISS প্রশান্ত মহাসাগরে বিসর্জন দেওয়া হবে, তখন পৃথিবীর কক্ষপথে মানুষের একমাত্র স্থায়ী বৈজ্ঞানিক ঠিকানা হিসেবে টিকে থাকবে চীনের এই ‘স্বর্গীয় প্রাসাদ’।
তিয়াংগং-এর সূচনা
তিয়াংগং স্টেশনের মূল মডিউল ‘তিয়ানহে’ ২০২১ সালের এপ্রিলে উৎক্ষেপণ করা হয় এবং ২০২২ সালের শেষ নাগাদ তিনটি প্রধান মডিউলের মাধ্যমে এটি পূর্ণতা পায়। পশ্চিমা ISS যেখানে ১৫টি দেশের যৌথ প্রচেষ্টায় তৈরি, চীন সেখানে সম্পূর্ণ একক শক্তিতে এটি গড়ে তুলেছে। তিয়াংগং আকারে ছোট হলেও এটি অনেক বেশি আধুনিক ও দক্ষ। এর অত্যাধুনিক প্রপালশন সিস্টেম এবং রোবোটিক আর্ম এটিকে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে পশ্চিমা প্রযুক্তির চেয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে রেখেছে।
তিয়াংগং যেভাবে পশ্চিমাদের চেয়ে ব্যতিক্রম
চীনের 'তিয়াংগং' এবং আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের (ISS) মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো এর অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং একক সার্বভৌমত্ব। যেখানে ISS ১৫টি দেশের যৌথ ও পুরনো প্রযুক্তির (নব্বইয়ের দশকের) সমন্বয়, সেখানে তিয়াংগং চীনের নিজস্ব শক্তিতে তৈরি বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক মহাকাশ স্টেশন। এর সবচেয়ে বড় ব্যতিক্রম হলো এর ইলেকট্রিক প্রপালশন সিস্টেম (Hall effect thrusters), যা মহাকাশে স্টেশনের অবস্থান ধরে রাখতে অত্যন্ত কম জ্বালানি খরচ করে—যা ISS-এ নেই।
এছাড়া, তিয়াংগং-এর সাথে যুক্ত হতে যাওয়া 'শুন্তিয়ান' (Xuntian) টেলিস্কোপটি একটি অনন্য উদ্ভাবন। এটি হাবল টেলিস্কোপের চেয়ে ৩০০ গুণ বড় ক্ষেত্র পর্যবেক্ষণ করতে পারে এবং মেরামতের প্রয়োজনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্টেশনের সাথে যুক্ত হতে পারে। স্টেশনের ভেতরের সব ইন্টারফেস ও অপারেটিং সিস্টেম সম্পূর্ণ ম্যান্ডারিন ভাষায় পরিচালিত, যা চীনের প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতার প্রতীক। মূলত, ISS যখন অবসরের দ্বারপ্রান্তে, তিয়াংগং তখন আগামী দশকের মহাকাশ গবেষণার আধুনিক ও সাশ্রয়ী বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
নাসার নিষেধাজ্ঞা
২০১১ সালে মার্কিন কংগ্রেস ‘ওল্ফ অ্যামেন্ডমেন্ট’ (Wolf Amendment) পাসের মাধ্যমে নাসাকে চীনের সাথে যে কোনো ধরণের বৈজ্ঞানিক সহযোগিতায় নিষিদ্ধ করে। জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে চীনা বিজ্ঞানীদের ISS-এ প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়নি। এই অবমাননা চীনকে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার জেদ বাড়িয়ে দেয়। চীন তখন সিএনএসএ (CNSA) এর মাধ্যমে নিজস্ব প্রযুক্তিতে রকেট, মহাকাশযান এবং জীবনদানকারী ব্যবস্থা তৈরি করে। আজ সেই আমেরিকাই যখন মহাকাশ স্টেশন হারানোর ভয়ে চিন্তিত, চীন তখন কক্ষপথে মহাকাশচারী পাঠাচ্ছে নিয়মিত বিরতিতে।
নেপথ্যের কারিগর কারা
চীনের এই সাফল্যের পেছনে সিংহুয়া ইউনিভার্সিটি (Tsinghua University), বেইহাং ইউনিভার্সিটি (Beihang University) এবং হারবিন ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (HIT)-এর বিজ্ঞানীরা এই প্রকল্পের মূল মেরুদণ্ড। গু ঝোংঝি (Gu Zhongzhi) তিয়াংগং প্রকল্পের প্রধান নকশাকার এবং সিনিয়র বিজ্ঞানী।
তাঁর নেতৃত্বে চীনের কয়েক হাজার তরুণ প্রকৌশলী গত দুই দশক ধরে নিঃশব্দে কাজ করেছেন লং মার্চ রকেট এবং মডিউলগুলোর ডকিং সিস্টেম নিয়ে।
ব্যয় এবং বিশাল লক্ষ্যমাত্রা
তিয়াংগং স্টেশন তৈরি এবং পরিচালনায় চীন এখন পর্যন্ত আনুমানিক ২০ থেকে ৩৫ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। তবে এটি কেবল শুরু। চীনের লক্ষ্যমাত্রা হলো ২০৪৫ সালের মধ্যে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মহাকাশ শক্তিতে পরিণত হওয়া। তারা পরিকল্পনা করছে এই স্টেশনে একটি মেগা-টেলিস্কোপ (Xuntian) যুক্ত করার, যা নাসার হাবল টেলিস্কোপের চেয়ে ৩০০ গুণ বেশি শক্তিশালী হবে।
এশিয়া ও বাংলাদেশের জন্য সুফল
তিয়াংগং কেবল চীনের নয়, এটি উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য এক বিশাল সুযোগ। চীন ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে যে তাদের স্টেশন সব দেশের জন্য উন্মুক্ত।
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার বিজ্ঞানীরা চীনের সাথে মহাকাশ চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ তাদের স্যাটেলাইট প্রযুক্তি উন্নত করতে পারবে। বাংলাদেশের তরুণ বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যতে তিয়াংগং-এ গিয়ে গবেষণা করার সুযোগ পাবেন।
প্রযুক্তির বিনিময় খাতে কৃষি, আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় চীন তাদের মহাকাশ থেকে প্রাপ্ত ডেটা এশীয় দেশগুলোর সাথে শেয়ার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা বাংলাদেশের কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।
বৈশ্বিক প্রভাব ও আগামীর রাজনীতি
২০৩০ সালের পর যখন বিশ্বের সব দেশের বিজ্ঞানীদের পরীক্ষার জন্য বেইজিংয়ের দ্বারস্থ হতে হবে, তখন মহাকাশ কূটনীতিতে চীনের অবস্থান হবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। আমেরিকা যেখানে মহাকাশকে বাণিজ্যিকীকরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, চীন সেখানে ‘মানবজাতির ভাগ করা ভবিষ্যৎ’ (Shared Future) স্লোগান দিয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নিজের পাশে টানছে।
মহাকাশ থেকে চীন এখন পুরো পৃথিবীকে এক নতুন বার্তা দিচ্ছে। নাসা যাদের নিষিদ্ধ করেছিল, তারাই আজ কক্ষপথের রাজা। তিয়াংগং কেবল একটি ল্যাবরেটরি নয়, এটি চীনের বিজ্ঞান ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক চিরস্থায়ী বিজয়স্তম্ভ।