পেমেন্টের জন্য কিউআর কোড অতীত: চীনে চলছে ‘ফেস-পে’ বিপ্লব

আসিফুল হাসনাত সিদ্দিকী
০৪ মার্চ, ২০২৬
পেমেন্টের জন্য কিউআর কোড অতীত: চীনে চলছে ‘ফেস-পে’ বিপ্লব
পেমেন্টের জন্য কিউআর কোড অতীত: চীনে চলছে ‘ফেস-পে’ বিপ্লব
শেয়ার

স্মার্টফোন পকেটে, হাতে কোনো মানিব্যাগ নেই, এমনকি কিউআর কোড স্ক্যান করার ঝামেলাও নেই—শুধু ক্যামেরার সামনে একটি ‘হাসি’ (Smile) দিলেই সম্পন্ন হচ্ছে কেনাকাটা। চীন এখন আর কেবল ক্যাশলেস বা নগদহীন সমাজ নয়, দেশটি এখন প্রবেশ করেছে ‘ডিজিটাল বায়োমেট্রিক’ বা ফেস-পে (Face-Pay) যুগে। পশ্চিমা বিশ্ব যখন এখনো প্লাস্টিক কার্ড আর চিপ প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করছে, চীন তখন মানুষের মুখমণ্ডলকেই বানিয়ে ফেলেছে বৈশ্বিক ওয়ালেট।

 

মাইক্রোচিপ কার্ড থেকে ফেস-পে: সময়ের ব্যবধান
বিশ্বের অন্যান্য দেশ যেখানে গত ৩০-৪০ বছর ধরে ম্যাগনেটিক স্ট্রাইপ বা মাইক্রোচিপযুক্ত ক্রেডিট কার্ডের ওপর নির্ভরশীল ছিল, চীন সেখানে অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে বিবর্তন ঘটিয়েছে। ২০০০-এর দশকের শুরুতেও চীন ছিল মূলত নগদ নির্ভর দেশ। কিন্তু ২০১০ সালের পর আলিপে (Alipay) ও উইচ্যাট (WeChat) এর কিউআর কোড বিপ্লব মাত্র ৫-৭ বছরের মধ্যে চিপ কার্ডের প্রয়োজনীয়তা প্রায় শেষ করে দেয়। এরপর ২০১৬-১৭ সাল থেকে ফেস-পে প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু হয়। অর্থাৎ, কার্ড থেকে সরাসরি বায়োমেট্রিক পেমেন্টে পৌঁছাতে চীনের সময় লেগেছে মাত্র এক দশকের কিছু বেশি। এটি মানব সভ্যতার আর্থিক লেনদেনের ইতিহাসে দ্রুততম প্রযুক্তিগত রূপান্তর।

 

বিশ্বে ক্যাশলেস প্রযুক্তির অবস্থান
বর্তমানে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো (যেমন সুইডেন, নরওয়ে) এবং এশিয়ার মধ্যে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া ক্যাশলেস প্রযুক্তিতে শীর্ষে। তবে পশ্চিমা দেশগুলো মূলত কার্ড-বেজড (Card-based) ক্যাশলেস ব্যবস্থায় আটকে আছে। অন্যদিকে, চীন কিউআর কোডকেও ‘পুরানো’ ঘোষণা করে এখন ফেস-আইডি বা পাম-স্ক্যান (হাতের তালু) প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে।

 

চীন কেন ব্যতিক্রম এবং অনন্য?
চীনের অনন্যতা হলো তাদের ‘সুপার অ্যাপ’ ইকোসিস্টেম। পশ্চিমা বিশ্বে পেমেন্টের জন্য পেপ্যাল, মেসেজিংয়ের জন্য হোয়াটসঅ্যাপ এবং সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য ফেসবুক আলাদা। কিন্তু চীনের উইচ্যাট বা আলিপে-তে সবকিছু একীভূত। এই একীভূত ডেটাবেজই চীনকে ফেস-পে প্রযুক্তি দ্রুত চালু করতে সাহায্য করেছে। যেখানে অন্য দেশগুলো অবকাঠামো নিয়ে ভাবছে, চীন সেখানে কোটি কোটি মানুষের ফেস-ডেটাকে পেমেন্ট গেটওয়ের সাথে সফলভাবে যুক্ত করে ফেলেছে।

 

 

 

 

৭৫ কোটি মানুষ ফেস পে ব্যবহার করছেন 
বর্তমানে বেইজিং, সাংহাই, শেনজেন এবং হাংজু-র মতো মেগাসিটিগুলোতে ফেস-পে প্রযুক্তি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। হাংজু-কে বলা হয় এই প্রযুক্তির কেন্দ্রবিন্দু। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চীনের প্রায় ৭৫০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ (৭৫ কোটি) নিয়মিতভাবে কোনো না কোনো ধরনের বায়োমেট্রিক পেমেন্ট (ফেস বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট) ব্যবহার করছেন। আলিপের ‘স্মাইল টু পে’ মেশিন এখন চীনের শত শত শহরের সুপারমার্কেট থেকে শুরু করে ছোট ছোট কনভিনিয়েন্স স্টোরেও শোভা পাচ্ছে।

 

লক্ষ্যমাত্রা: ফোন-মুক্ত ভবিষ্যৎ
চীনের পরবর্তী লক্ষ্যমাত্রা হলো স্মার্টফোন থেকেও ব্যবহারকারীকে মুক্তি দেওয়া। ২০৩০ সালের মধ্যে চীনের অধিকাংশ রিটেইল লেনদেনকে সরাসরি মুখমণ্ডল বা বায়োমেট্রিক স্ক্যানের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে কোনো ডিভাইসের ওপর নির্ভরশীলতা ছাড়াই মানুষ এক শহর থেকে অন্য শহরে ভ্রমণ এবং কেনাকাটা করতে পারবে।

 

ফেস-পে যুগের সুবিধা: কেন এই প্রযুক্তি?
গতি ও দক্ষতা: কিউআর কোড স্ক্যান করতে অন্তত ৫-১০ সেকেন্ড লাগে, ফেস-পে লাগে মাত্র ১-২ সেকেন্ড।
হ্যান্ডস-ফ্রি অভিজ্ঞতা: দুই হাতে কেনাকাটার ব্যাগ থাকলেও পেমেন্ট করতে কোনো সমস্যা হয় না।
নিরাপত্তা: কার্ড বা ফোন চুরি হতে পারে, কিন্তু ফেস-ডেটা থ্রি-ডি ক্যামেরায় নকল করা অসম্ভব। এটি জালিয়াতি কমিয়ে এনেছে শূন্যের কোঠায়।
অন্তর্ভুক্তি: বয়স্ক মানুষ বা যারা স্মার্টফোন অ্যাপ চালাতে দক্ষ নন, তাদের জন্য শুধু ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো অনেক সহজ।

 

পশ্চিমা আধিপত্য বনাম চীনের সার্বভৌমত্ব
এই প্রযুক্তির উত্থানের পেছনে ভূ-রাজনৈতিক কৌশলও স্পষ্ট। কয়েক দশক ধরে বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ন্ত্রিত হয়েছে মার্কিন প্রতিষ্ঠান ভিসা (Visa), মাস্টারকার্ড (Mastercard) এবং সুইফট (SWIFT) এর মাধ্যমে। ফেস-পে এবং ডিজিটাল ইউয়ান (e-CNY) চালুর মাধ্যমে চীন একটি সমান্তরাল পেমেন্ট নেটওয়ার্ক তৈরি করছে।
এটি পশ্চিমা ডলার-নির্ভর ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর চীনের নির্ভরতা কমিয়ে দিচ্ছে। পশ্চিমা প্রযুক্তি ব্লক করার আগেই চীন নিজস্ব ‘বায়োমেট্রিক ইকোসিস্টেম’ গড়ে তুলে বিশ্বকে বার্তা দিচ্ছে যে, আগামীর অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আর ওয়াশিংটনের হাতে নয়, বরং বেইজিংয়ের প্রযুক্তির হাতে থাকবে।

 

চীনের এই ফেস-পে বিপ্লব কেবল একটি বিলাসিতা নয়, এটি একটি সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক ঢাল। প্রযুক্তির এই জয়যাত্রা প্রমাণ করে যে, চীন এখন আর শুধু পশ্চিমা উদ্ভাবনের অনুসারী নয়, বরং তারা নিজেরাই আগামীর পৃথিবীর নিয়ম তৈরি করছে।

মতামত