১০ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে কেন চীনা ভাষা শেখাতে চায় চীন সরকার
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে যাচ্ছে। অবকাঠামো এবং বাণিজ্যের পর চীন এবার নজর দিয়েছে ‘সফট পাওয়ার’ বা সাংস্কৃতিক কূটনীতিতে। এর অংশ হিসেবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে অন্তত ১০ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে চীনা ভাষা (ম্যান্ডারিন) শেখানোর এক বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে চীন সরকার। এই উদ্যোগের মাধ্যমে দুই দেশের জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার নতুন সমীকরণ দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
কেন এই উদ্যোগ এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
চীন সরকারের এই উদ্যোগের পেছনে মূল কারণ হলো ভাষাগত দূরত্ব ঘুচিয়ে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করা। বাংলাদেশে চীনের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্পের কার্যক্রম চলছে। এসব প্রকল্পে কাজ করতে গিয়ে চীনা এবং বাংলাদেশি কর্মীদের মধ্যে যে ভাষাগত বাধার সৃষ্টি হয়, তা দূর করাই এই প্রকল্পের প্রাথমিক লক্ষ্য। একইসাথে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর প্রচুর শিক্ষার্থী চীনে পড়তে যাচ্ছেন; তাদেরকে এই প্রকল্পের টার্গেটে রাখা হয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক যোগসূত্র:
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাবের বিপরীতে চীন তার ‘সফট পাওয়ার’ বাড়াতে আগ্রহী। ১০ হাজার তরুণ যদি চীনা ভাষায় দক্ষ হয়, তবে তারা মানসিকভাবে চীনের সংস্কৃতি ও চিন্তাধারার প্রতি ইতিবাচক হবে। এটি দীর্ঘমেয়াদে চীনের জন্য একটি শক্তিশালী বন্ধুত্বপূর্ণ জনবল বা ‘প্রো-চায়না’ প্রজন্ম তৈরি করতে সহায়ক হবে, যা দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতিতে চীনের অবস্থানকে আরও সুসংহত করবে।
লক্ষ্যমাত্রা, বিনিয়োগ ও সময়সীমা
চীন সরকার ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে এই ১০ হাজার শিক্ষার্থীর লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে চায়। এর জন্য বড় অঙ্কের একটি তহবিল গঠন করা হয়েছে। যদিও সঠিক অংকটি এখনো অপ্রকাশিত, তবে ধারণা করা হচ্ছে ভাষা শিক্ষা কেন্দ্র স্থাপন, চীনা শিক্ষকদের আবাসন, শিক্ষা উপকরণ এবং স্কলারশিপ মিলিয়ে কয়েক মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে চীন। এই পুরো অর্থায়নটি চীনের শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট সদর দপ্তরের মাধ্যমে পরিচালিত হবে।
বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বর্তমান অবস্থা
বর্তমানে বাংলাদেশে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চীনা ভাষা শেখানো হচ্ছে। এরমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি: বেসরকারি পর্যায়ে প্রথম কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট। এবং শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটির কনফুসিয়াস ক্লাসরুমের মাধ্যমে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সুখবর:
চট্টগ্রামের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক গুরুত্ব এবং বঙ্গবন্ধু টানেলসহ বিভিন্ন প্রকল্পে চীনা বিনিয়োগের কথা মাথায় রেখে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) খুব শীঘ্রই চীনা ভাষা শিক্ষা কোর্স চালু হতে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, চবি প্রশাসন ও চীনা দূতাবাসের মধ্যে এ বিষয়ে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই শিক্ষার্থীরা এখানে চীনা ভাষা শেখার সুযোগ পেতে পারেন।
পাইলট প্রকল্প ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া
এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অংশ হিসেবে চীন একটি পাইলট প্রকল্প শুরু করেছে। এই প্রকল্পের অধীনে প্রথমে দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্বল্পমেয়াদী ‘বেসিক ম্যান্ডারিন’ কোর্স করানো হচ্ছে। এই পাইলট প্রকল্পের সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী ‘অ্যাডভান্সড’ লেভেলের কোর্সগুলো ডিজাইন করা হবে। অনলাইনে ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাব এবং সরাসরি চীনা শিক্ষকদের উপস্থিতিতে এই পাঠদান কার্যক্রম চলবে।
মালিশাএডুর ভূমিকা
এই শিক্ষা বিপ্লবের অন্যতম সহযোগী হিসেবে কাজ করছে বাংলাদেশের প্রথম সারির চীনভিত্তিক শিক্ষা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মালিশাএদু (MalishaEdu)। তারা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের চীনে উচ্চশিক্ষা এবং সরকারি স্কলারশিপ প্রাপ্তিতে সরাসরি কাজ করছে।
মালিশাএডুর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মারুফ মোল্লা এই উদ্যোগ সম্পর্কে বলেন, "চীন সরকারের এই ১০ হাজার শিক্ষার্থীকে ভাষা শেখানোর উদ্যোগটি বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল সুযোগ। বর্তমানে বাংলাদেশে অনেক চীনা কোম্পানি কাজ করছে, কিন্তু তারা ভাষা না বোঝার কারণে অনেক সময় দক্ষ কর্মী পায় না। শিক্ষার্থীরা চীনা ভাষা শিখলে তাদের জন্য দেশে এবং চীনে ক্যারিয়ার গড়ার অবারিত সুযোগ তৈরি হবে। মালিশাএডু শিক্ষার্থীদের এই ভাষা শিক্ষার পাশাপাশি চীনের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির ক্ষেত্রে পূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করছে।"
বাংলাদেশের বেনিফিট ও শিক্ষার্থীদের লাভ
শিক্ষার্থীদের সুবিধা:
উচ্চশিক্ষা: বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য চীনে যাচ্ছেন। ভাষা জানা থাকলে তারা এইচএসকে (HSK) পরীক্ষায় ভালো করে পূর্ণাঙ্গ সরকারি স্কলারশিপ পেতে পারেন।
চাকরি: বাংলাদেশে কর্মরত প্রায় ৫০০ চীনা কোম্পানিতে চীনা ভাষা জানা দোভাষী ও কর্মকর্তাদের চাহিদা আকাশচুম্বী। একজন সাধারণ গ্র্যাজুয়েটের চেয়ে চীনা ভাষা জানা তরুণের বেতন ৩০-৫০% বেশি হতে পারে।
১০ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে ম্যান্ডারিন শেখানোর এই উদ্যোগ কেবল একটি ভাষা শিক্ষা প্রকল্প নয়, বরং এটি দুই দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের নতুন সেতুবন্ধন। এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হলে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ বিশ্ববাজারে এক অনন্য প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা লাভ করবে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।